করোনায় বাড়বাড়ন্ত বিস্কুটের ব্যবসা

93

চলুন, একটু কল্পনার জগতে ঘুরে আসি। করোনার যে সময়টায় ঘরবন্দী জীবন কাটিয়েছেন, ফিরে যান সেই দিনগুলোতে। সকাল, বিকেল, সন্ধ্যা কিংবা দিনের নানা সময়ে ‘চায়ের সঙ্গে টা’ নিশ্চয়ই ছিল। সবার যে ছিল, সে কথা হয়তো হলফ করে বলা যাবে না। তবে বাঙালির জীবনে ‘চায়ের সঙ্গে টা’–তো বলতে গেলে নিত্যসঙ্গী। এই ‘টা’র একটা বড় অংশজুড়েই থাকে নানা স্বাদের বিস্কুট। কারও পছন্দ ঝাল–ঝাল, কারও বা মিষ্টি। চকলেট, ক্রিম বিস্কুটের ভক্তও তো আছে ঘরে ঘরে।

বাঙালির ছোট–বুড়ো সবার বিস্কুটপ্রীতি নিয়েই তাই অন্নদাশঙ্কর রায় লিখে গেছেন ‘বিস্কুট’ নিয়ে ছড়া। ‘কুট কুট বিস্কুট/ মুঠ মুঠ বিস্কুট, যেথা রাখি লুকিয়ে/ গন্ধটি শুকিয়ে, সেথা করে লুট! লুট!, …কে খায় রে, কে খায় রে/ শুনে দেয় ছুট! ছুট।’ ছড়ার মতো বিস্কুটের গন্ধে ছুটে চলার দৃশ্য খুব বেশি চোখে দেখা না গেলেও ব্যবসার তথ্য বলছে বিস্কুটের ব্যবসা বেশ বাড়বাড়ন্ত। করোনার মধ্যে যেখানে অন্য অনেক ব্যবসায় মন্দা, সেখানে বিস্কুটের বিক্রি বেড়েছে তরতর করে। শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত একাধিক বিস্কুট কোম্পানির বিক্রির হিসাব ঘেঁটে ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলে এ তথ্য পাওয়া গেছে। এর মধ্যে বিস্কুটসহ কনফেকশনারি বিক্রিতে রেকর্ডও করেছে একটি কোম্পানি।

কেন করোনার মধ্যে বিস্কুটের ব্যবসার বাড়বাড়ন্ত—এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে জানা গেল, করোনার কারণে সব শ্রেণির মানুষের মধ্যে স্বাস্থ্যসচেতনতা বেড়েছে। এ কারণে প্যাকেটজাত খাবারের প্রতি মানুষের আগ্রহ অনেক বেড়ে গেছে। আবার ঘরবন্দী সময়ে চাল–ডালের সঙ্গে ঘরে বাড়তি বিস্কুটও কিনে রেখেছিল মানুষ। সব মিলিয়ে তাতে বিক্রি বেড়েছে কোম্পানিগুলোর। অথচ করোনার কারণে গত বছরের মার্চ, এপ্রিল ও মে মাস বলতে গেলে দোকানপাটই বন্ধ ছিল। দোকানপাট বন্ধের মধ্যেও বিস্কুটের বিক্রির বাড়বাড়ন্ত প্রমাণ করে করোনার মধ্যে ঘরে ঘরে বাড়তি বিস্কুট কিনে রেখেছিল মানুষ।

বিস্কুটের ব্যবসার সঙ্গে জড়িত কোম্পানিগুলো বলছে, দেশে প্রতিবছর ১৫ থেকে ২০ শতাংশ হারে বড় হচ্ছে বিস্কুটের বাজার। বর্তমানে এ বাজারের আকার বছরে প্রায় ৬ হাজার কোটি টাকার। দেশের বিস্কুটের ব্যবসার জন্য প্রতিষ্ঠিত কোম্পানি যেমন আছে, তেমনি আছে জেলা ও শহরভিত্তিক কোম্পানিও। আবার বিভিন্ন মিষ্টি ও কনফেকশনারি কোম্পানিও বিস্কুট বিক্রি করে থাকে।

জানতে চাইলে ওয়েল গ্রুপের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) সৈয়দ নুরুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, করোনার মধ্যেও গ্রামাঞ্চলের জীবনযাত্রা বলতে গেলে অনেকটাই স্বাভাবিক ছিল। ওই সময় দেশে প্রচুর প্রবাসী আয়ও এসেছে, যার বড় অংশই গেছে গ্রাম–গঞ্জে। হাতে টাকা ছিল বলে মানুষের মধ্যে ভোগের প্রবণতাও ছিল। আমাদের অভিজ্ঞতায় আমরা দেখেছি, কম দামের বিস্কুটের বিক্রিই সবচেয়ে বেশি বেড়েছে, যার বড় অংশ বিক্রি হয় গ্রাম–গঞ্জে।

শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত খাদ্য খাতের কোম্পানি অলিম্পিক ইন্ডাস্ট্রিজ। দুই যুগ ধরে বিস্কুট ও কনফেকশনারির বাজারে বেশ দাপটের সঙ্গেই ব্যবসা করে যাচ্ছে কোম্পানিটি। ১৯৭৯ সালে যাত্রা শুরু করা এ কোম্পানির বিস্কুট ও কনফেকশারি ব্যবসা শুরু হয় ১৯৯৬ সালে। তার আগে ১৯৮৪ সালে এটি দেশের প্রধান শেয়ারবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে (ডিএসই) তালিকাভুক্ত হয়। দেশের বিস্কুটের বাজারে সিংহভাগ বাজার অংশীদারত্ব রয়েছে এ কোম্পানির দখলে।

গত জুনে সমাপ্ত কোম্পানিটির সর্বশেষ নিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, করোনার বছরে কোম্পানিটির বিক্রি বা আয় বেড়েছে ২১৬ কোটি টাকার। ২০১৯ সালের জুলাই থেকে গত বছরের জুন পর্যন্ত কোম্পানিটি ১ হাজার ৫৮৯ কোটি টাকার পণ্য বিক্রি করেছে, যার বড় অংশই এসেছে বিস্কুট বিক্রি থেকে। এ ক্ষেত্রে আয় বা বিক্রিতে প্রবৃদ্ধি হয়েছে প্রায় ১৬ শতাংশ।

কোম্পানিটি তাদের বার্ষিক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, ২০১৯–২০ অর্থবছরে কোম্পানিটি ১ লাখ মেট্রিক টন বিস্কুট, কনফেকশনারি ও বেকারি পণ্য বিক্রি করেছে, যা কোম্পানির ইতিহাসে প্রথম। রেকর্ড পরিমাণ বিক্রির কারণে কোম্পানিটির কর–পরবর্তী মুনাফায়ও ৮ শতাংশের বেশি প্রবৃদ্ধি হয়েছে। বছর শেষে মুনাফার পরিমাণ ছিল প্রায় ২০২ কোটি টাকা।

দেশের বাজারে বিক্রি বাড়ার পাশাপাশি বিদেশে রপ্তানিও বাড়ছে বিস্কুটের। বিশ্বের ১৪১টি দেশে বিস্কুট রপ্তানি করে এ বাজারের আরেক দেশি জায়ান্ট কোম্পানি প্রাণ গ্রুপও। বিস্কুট রপ্তানিতে তাদের বার্ষিক প্রবৃদ্ধি ৪০ শতাংশের মতো। দেশের বাজারেও তাদের বিক্রি প্রবৃদ্ধি ১৫ শতাংশ।

জানতে চাইলে প্রাণ আরএফএল গ্রুপের পরিচালক (বিপণন) কামরুজ্জামান কামাল বলেন, ‘করোনার মধ্যেও ২০২০ সালে দেশের বাজারে আমাদের বিস্কুট বিক্রিতে খুবই ভালো প্রবৃদ্ধি হয়েছে। দোকানপাট বন্ধ থাকলেও ঘরে ঘরে বিস্কুটের বেশ চাহিদা ছিল।’

খাত–সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, দেশে বর্তমানে বিস্কুটের বাজারে ২০টির বেশি ব্র্যান্ডেড কোম্পানি রয়েছে। এর মধ্যে শীর্ষস্থানীয় কোম্পানিগুলো হচ্ছে অলিম্পিক, প্রাণ, নাবিস্কো, হক, বঙ্গজ, ড্যানিশ, কিষোয়ান, ওয়েলফুড, কোহিনুর ইত্যাদি। বিস্কুটের বাজারের সিংহভাগই এসব কোম্পানির দখলে। এর মধ্যে অলিম্পিক ও প্রাণের বাজার অংশীদারত্ব বেশি।

শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত এ খাতের আরেক কোম্পানি বঙ্গজের বিক্রিতে প্রায় ৫০ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয়েছে করোনাকালেও। কোম্পানিটির ২০১৯–২০ অর্থবছরের বার্ষিক প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, উল্লেখিত বছরে কোম্পানিটির বিক্রির পরিমাণ ছিল প্রায় ২৬ কোটি টাকা। আগের বছর যার পরিমাণ ছিল ১৮ কোটি টাকা। সেই হিসাবে করোনার বছরে বঙ্গজের বিক্রি বেড়েছে ৮ কোটি টাকার বা ৪৫ শতাংশ।

শুধু দেশের বাজারে নয়, বিক্রি বাড়ছে বিদেশেও। তার প্রমাণ মিলছে রপ্তানির তথ্যেও। দুই বছর আগে, ২০১৭-১৮ অর্থবছরে বিস্কুট রপ্তানির পরিমাণ ছিল প্রায় সোয়া তিন কোটি মার্কিন ডলার। প্রতি ডলারের বিনিময়মূল্য ৮৫ টাকা ধরে হিসাব করলে বাংলাদেশি মুদ্রায় যার পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ২৭৯ কোটি টাকা। সর্বশেষ ২০১৯-২০ অর্থবছরে রপ্তানির পরিমাণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৪২৫ কোটি টাকা বা ৫ কোটি মার্কিন ডলারে। মাত্র দুই বছরের ব্যবধানে বিস্কুট রপ্তানিতে ৫২ শতাংশের বেশি প্রবৃদ্ধি হয়েছে।

২০২০-২১ অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসেই (জুলাই-ডিসেম্বর) বিস্কুট রপ্তানির পরিমাণ ৪ কোটি ১৫ লাখ মার্কিন ডলার বা ৩৫০ কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে। রপ্তানির ঊর্ধ্বমুখী এ ধারা অব্যাহত থাকলে বছর শেষে বিস্কুট রপ্তানির পরিমাণ ৫০০ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাবে বলে মনে করছেন খাত–সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।

জানতে চাইলে প্রাণ–আরএফএলের পরিচালক (বিপণন) কামরুজ্জামান কামাল বলেন, ‘বাংলাদেশের বিস্কুটের সবচেয়ে বেশি চাহিদা রয়েছে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশ, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর ও ভারতে। বিস্কুট একটি আন্তর্জাতিক পণ্য। পৃথিবীর সব দেশেই বিস্কুটের চাহিদা রয়েছে। স্বাদ ও দামের কারণে আমাদের দেশের বিস্কুটের চাহিদা বিভিন্ন দেশে দিন দিন বাড়ছে।’

খাত–সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বিশ্বের অন্যান্য দেশের তুলনায় বাংলাদেশের বিস্কুটের দাম কম। এ ছাড়া প্রবাসী বাংলাদেশিদের মধ্যে দেশের বিস্কুটের প্রতি আলাদা আকর্ষণ রয়েছে। তাই যেসব দেশে বাংলাদেশি যত বেশি, সেসব দেশে বাংলাদেশের বিস্কুটের রপ্তানিও তত বেশি।