বিচারপতি মির্জা হোসেইন হায়দার বলেন

71

২০ বছর বিচারিক দায়িত্ব পালন শেষে অবসরে গেছেন আপিল বিভাগের বিচারক বিচারপতি মির্জা হোসেইন হায়দার। বিদায়বেলায় বিচারক ও বিচারব্যবস্থাকে এক করে না ফেলার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।

বিচারপতি মির্জা হোসেইন হায়দার বলেন, ‘অনেক সময় বিচার বিভাগ প্রদত্ত আইনের ব্যাখ্যা নিয়ে সমালোচনার ঝড় ওঠে। অনেক ক্ষেত্রে বিচারক ও বিচারব্যবস্থাকে এক করে ফেলা হয়। আমরা ভুলে যাই যে, বিচারকও একজন মানুষ।’

সুবিচারের প্রতীক সর্বোচ্চ আদালতের গায়ে কালিমা লাগে, এমন কিছু না করার আহ্বান জানান বিদায়ী এই বিচারক।

বিচারপতি মির্জা হোসেইন হায়দার বিচারিক জীবনের শেষ কার্যদিবস পালন করে রোববার অবসরে যান। অ্যাটর্নি জেনারেল এবং সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির পক্ষ থেকে তাকে বিদায়ী সংবর্ধনা দেয়া হয়। এ সময় নিজের বক্তব্য তুলে ধরেন বিচারপতি হায়দার। এ অনুষ্ঠানে ভার্চুয়ালি যুক্ত হয়ে সবাই তাকে বিদায়ী সংবর্ধনা দেন।

বিচারপতি মির্জা হোসেইন হায়দার বলেন, ‘সাংবিধানিকভাবে বিচার বিভাগ স্বাধীন, কিন্তু বাস্তবে কতটুকু তা আমরা সকলেই জানি এবং বুঝি।

‘রাষ্ট্রের তিনটি বিভাগের (নির্বাহী, আইন ও বিচার) চৌহদ্দি সংবিধানে নির্দিষ্ট করে দেয়া হয়েছে। যেখানে একে অপরের পরিপূরক হিসেবে থাকার নির্দেশনাও আছে। নিজ নিজ পরিধির মধ্যে থেকে কে কতটুকু কাজ করবে তা সংবিধানে নির্দিষ্ট করে দেয়া হয়েছে, যাতে কেউ রেখা অতিক্রম করতে না পারে।’

লিখিত বক্তব্যে নিজের শিক্ষা ও কর্মজীবনের কিছু বিষয় তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আইন শাস্ত্রে অনার্স ও মাস্টার্স শেষ করে আইন পেশায় আত্মনিয়োগ করতে শ্বেতশুভ্র ভবনটিতে (সুপ্রিম কোর্ট অঙ্গন) প্রবেশ করি। সেই থেকে এই ভবনটিকে আমি আমার দ্বিতীয় বাড়ি হিসেবে গ্রহণ করে নিই। সকাল থেকে সন্ধ্যা এমনকি রাত পর্যন্ত এখানে কাজের মধ্য দিয়ে সময় কেটেছে।

‘একপর্যায়ে ২২ বছরের ওকালতি জীবনের ইতি টেনে ২০০১ সালে বিচারপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন শুরু করি। সেদিন থেকেই আমার জীবনের মোড়টা ঘুরে যায়। তখনই মনে হয়েছে, সত্য যে কঠিন, সে কঠিনেরে ভালবাসিলাম।’

দেশের বিচারব্যবস্থা সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘আমি বিশ্বাস করি সবার যৌথ প্রয়াসেই বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থা আরও পরিণত ও উন্নত হবে। সমষ্টিগত প্রয়াস ও প্রচেষ্টাই ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার পূর্বশর্ত। তাই বিচারক থেকে শুরু করে বিচারব্যবস্থার সঙ্গে সম্পৃক্ত সবারই নিবিড়ভাবে সংযুক্ত হয়ে কাজ করতে হবে। সুবিচার ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে হলে বিচারালয়ের সর্বনিম্ন পর্যায়ের কর্মকর্তা থেকে সর্বোচ্চ পদাধিকারীর ঐক্যবদ্ধ থাকা একান্ত প্রয়োজন।’

বিচারপতি মির্জা হোসেইন হায়দার বলেন, ‘বিচারব্যবস্থা তার নিজস্ব গতিতেই চলে। শত চেষ্টা চালিয়েও কেউ তার গতি রোধ করতে পারে না, পারবে না। যত বাধা বিপত্তি কিংবা ঘাত-প্রতিঘাতই আসুক না কেন, আমাদের ঐকান্তিক ও ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টায় বিচার বিভাগের গতি কেউ রোধ করতে পারবে না।’

আইনের তত্ত্ব, তথ্য ও উপাত্ত পরিষ্কারভাবে না জেনে-বুঝে আদালতের রায়কে কেউ যেন বিতর্কিত না করেন সে আহ্বান জানান তিনি।

সংবিধান অনুযায়ী, নির্ধারিত বয়স পূর্ণ হলে বিচারপতিকে অবসরে যেতে হয়। এর ধারাবাহিকতায় বিচারপতি মির্জা হোসেইন হায়দার অবসরে গেলেন।

অ্যাটর্নি জেনারেল কার্যালয়ের পক্ষ থেকে অ্যাটর্নি জেনারেল এ এম আমিন উদ্দিন, সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির পক্ষ থেকে সমিতির সম্পাদক ব্যারিস্টার রুহুল কুদ্দুস কাজল তাকে সংবর্ধনা দেন। এ সময় প্রধান বিচারপতি, আপিল বিভাগের বিচারকসহ সিনিয়র আইনজীবীরা ভার্চুয়ালি যুক্ত ছিলেন।

বিচারপতি মির্জা হোসেইন হায়দার ১৯৫৪ সালের ১ মার্চ জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগ থেকে এলএলবি ও এলএলএম ডিগ্রি অর্জন করেন।

১৯৭৯ সালে জেলা আদালত, ১৯৮১ সালে হাইকোর্ট বিভাগ ও ১৯৯৯ সালে আপিল বিভাগের আইনজীবী হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হন। এরপর ২০০১ সালের ৩ জুলাই তিনি হাইকোর্ট বিভাগের অতিরিক্ত বিচারক এবং ২০০৩ সালের ৩ জুলাই স্থায়ী বিচারক হিসেবে নিয়োগ পান। সবশেষ ২০১৬ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি আপিল বিভাগের বিচারক হিসেবে নিয়োগ পান বিচারপতি মির্জা হোসেইন হায়দার