“বৃহস্পতিবার রাত আমার জীবনের কালো অধ্যায়”

78

২০০৭ সাল, তখন আমি হেফজখানার ছাত্র। সম্ভবত ৮/৯ পারা মুখস্থ করেছি। হোস্টেলে থাকতাম, বন্ধু রুমমেট আর শিক্ষকদের ঘিরেই ছিলো আমাদের জীবন।

শিক্ষকদের শাসন, বন্ধুদের দুষ্টামি এসবের মধ্যেই দিন কেটে যেতো। আনন্দ বিনোদন বলতে ছিলো বৃহস্পতিবার রাতে মুড়ি পার্টি আর শুক্রবার সকালের ফুটবল ম্যাচ। মাঝে মাঝে রাতে গার্ডকে ভূতের ভয় দেখানো আর মাদরাসার ছাদে ক্রিকেট ম্যাচ আমাদেরকে বাঁচিয়ে রাখতো চার দেয়ালের ভিতরে।

এরকম সময়েই এক বৃহস্পতিবার রাত আমার জীবনের কালো অধ্যায় হয়ে এসেছিলো। গরমের রাত বিদ্যুৎ না থাকায় মাদরাসার ছাদে বসে গল্প করছিলাম কয়েকজন বন্ধু। হোস্টেল সুপার সেটা দেখতে পেরে ছাদে উঠে আসেন। আমরা টের পেয়ে সবাই দৌড়ে যার যার রুমে চলে যাই। শিক্ষক কাউকে না পেয়ে ফিরে যান ৷ রুমে গিয়ে খাদেমকে ডেকে পাঠান আমার রুমে, এক্ষুনি যেতে হবে। আমি জামা গায়ে দিয়ে প্রবেশ করলাম হুজুরের রুমে। তিনি জিজ্ঞেস করলেন আমার সাথে আর কারা কারা ছিলো।

হেফজখানায় আমাদের একটা অভ্যাস ছিলো আমরা কেউ কোন অপরাধে ধরা পরলে অন্যের নাম কখনো বলতাম না। আমিও বন্ধুদের নাম বলিনি। অনেক্ষন চেষ্টা করে যখন অন্যদের পরিচয় জানতে পারেন নি তখন তিনি প্রিন্সিপালের মোবাইলে কল দিলেন। প্রিন্সিপালকে ফোন করে বললেন আমি না-কি বারবার মাদরাসার পিছনের বস্তির দিকে টর্চ লাইট মারছি। সেটার সাথে আরো যুক্ত করলেন অনেক কথা, বললেন আমি না-কি বস্তির কোন এক মেয়েকে উদ্দেশ্য করে লাইট মেরেছি।

শিক্ষকের মুখে এমন কথা শুনে আমি অবাক হই তখন। মুহুর্তের মধ্যে একটা লোক কতো বড়ো মিথ্যাচার করলেন আমার নামে। একজন ছাত্রকে ডেকে পাঠালেন বেত নিয়ে আসতে। রাত তখন প্রায় একটা বাজে।

বেত হাতে শিক্ষক আমাকে জিজ্ঞেস করলেন কেন বস্তিতে লাইট মেরেছি? আমি এটা অস্বীকার করি। তিনি কয়েকবার এই প্রশ্ন করে আমাকে মারতে শুরু করেন। প্রথম দিকের ১০/১২ টা আঘাতের কষ্ট অনুভব হয়, পরে অনেকটা শারিরিক ভাবে দূর্বল হয়ে পড়ি৷ শরীরে তখন আঘাতের কোন কষ্ট অনুভব করতে পারিনি। শুধু চোখে ঝাপসা ঝাপসা দেখেছিলাম শিক্ষক একটার পর একটা বেত হাতে নিচ্ছেন আর কয়েকটা আঘাতে সেটাও ভেঙ্গে যাচ্ছে।৬/৭ টা বেত ভেঙে যাওয়ার পর তিনি আঘাত করা বন্ধ করে আমাকে রুমে চলে যেতে বলেন।

শিক্ষকের রুমে থেকে বের হওয়ার কোন শক্তি আমার ছিলো না। দেয়ালে ধরে কোন রকম সেই রুম থেকে বের হয়ে ওয়াশরুমের সামনেই শুয়ে পড়ি। রুমমেট Monsur সহ আরও কয়েকজন মিলে আমাকে রুমে নিয়ে যায়।

প্রাথমিক চিকিৎসা হিসাবে ছিলো রুমমেটের ভ্যাসলিন আর ভিক্স। মনসুর সেটা আমার পিঠে লাগিয়ে দেয়। তখন সে জানায় পিঠের ৪ জায়গায় চামড়া ফেটে রক্ত বের হচ্ছে, ১২ জায়গায় রক্ত জমে আছে। পুরো শরীরে আঘাতের চিহ্ন আছে চল্লিশটার উপরে।

পরের তিন চারদিন আমি বিছানাতেই ছিলাম। জ্বর আর শরীরের ব্যাথা নিয়ে বিছানা থেকে উঠা সম্ভব ছিলো না। হোস্টেলে মোবাইল নিষিদ্ধ থাকায় বাসায় জানানোরও কোন সুযোগ পাইনি। বন্ধুরা তখন আমার রুমে আসতো। অনেকে একটা একটা করে আঘাতের চিহ্ন গণনা করতো। আমার প্রসংশা করতো, এতো বিপদে থেকেও আমি তাদের নাম বলিনি। অনেকে প্রতিশোধ নেয়ার বা প্রতিবাদ করার পরিকল্পনা করতো, তবে সেটা আমাদের কারো পক্ষে সম্ভব ছিলো না। আমাদের দাবি কিংবা প্রতিবাদগুলো শিক্ষকের বেতের কাছে অসহায় ছিলো।

২০০৭ সালের শেষের দিকে বাসায় বিভিন্ন অজুহাত দেখানো শুরু করি। হোস্টেলের খাবার ভালো না, কাপড় ধুতে কষ্ট হয় এসব বায়না ধরে বিদায় নেই সেই মাদরাসা থেকে। সেখান থেকে বিদায় নিলেও মন থেকে বিদায় জানাতে পারিনি সেই মিথ্যাচারের। মিথ্যা অজুহাতে আমার উপর অত্যাচারের। ধীরে ধীরে মুছতে থাকে আমার পিঠের সেই দাগ, কিন্তু আমি ভুলতে পারিনি সেই রাতের কাহিনি।

শিক্ষকের মিথ্যাচার আমার কানে সব সময় বাজতো। এই যে এখন আমি লিখছি ঠিক যেন এখন শুনতে পাচ্ছি শিক্ষকের মিথ্যা কথা। বেশ কয়েকবছর পর সম্ভবত সেটা ২০১৪/১৫ হবে, সেই শিক্ষকের সাথে আবার দেখা। সিলেটের বন্দর বাজারের একটা কাপড়ের দোকানে। আমাকে দেখে চিনতে না পারলেও আমি ঠিকই তাকে চিনতে পারি ৷ পরিচয় দিয়ে ভালো মন্দ জিজ্ঞেস করলাম। কুশল বিনিময় শেষেই তাকে প্রশ্ন করি – আমাকে সেদিন মিথ্যা দোষ দিয়ে মেরেছিলেন কেন? দোকানদার সহ কয়েকজন কাস্টমার আমার দিকে তাকিয়ে থাকে। শিক্ষক সেই কাহিনি মনে করতে পারেননি এমন ভাব করে অন্য আলাপে চলে যান। আমি বিদায় নিয়ে চলে আসি। আমি বুঝতে পারি ঘটনা তার পুরোপুরি মনে আছে। সুতরাং আর কখনো দেখা হলে আমি অবশ্যই জানতে চাইবো কাজটি কেন করেছিলেন।কিছুদিন পরেই একটা বিয়ের অনুষ্ঠানে আবার দেখা। আমি সালাম দিয়ে বললাম আপনি অন্যায় ভাবে আমাকে মেরেছিলেন। আমার পিঠের ৪ জায়গা দিয়ে রক্ত বের হয়েছিলো, ১২ জায়গায় রক্ত জমাট বেঁধেছিলো। আমার কোন চিকিৎসা হয়নি৷ শিক্ষক কিছুই বললেন না। তিনি সেটা মনেই করতে পারছেন না এমন ভাব। পরবর্তীতে আমি সিদ্ধান্ত নেই যখনই আমি তার দেখা পাবো তখনই আমার দোষ কী ছিলো সেটা জানতে চাইবো। সেটা জানার অধিকার আমার আছে। আসামী অবশ্যই জানার অধিকার রাখে কেন তাকে শাস্তি দেয়া হচ্ছে।

২০১৮ সালে একদিন কিছু কাজে মুর্শিদের বাড়িতে যাই। সেখানে একটি রুমে বেশ কয়েকজন আলেম বসা ছিলেন। সেই শিক্ষককেও সেখানে বসে থাকতে দেখি৷ আমি সালাম দিয়ে একটু উচ্চ কণ্ঠেই বলা শুরু করলাম ‘ আপনিতো আমাদের সেই শিক্ষক যিনি অন্যায় ভাবে ছাত্রদের মারতেন। আমাকে ১১ বছর আগে আপনি অন্যায় ভাবে মেরেছিলেন। ১১ বছর ধরে আমি জানতে চাচ্ছি আমার অপরাধ কী ছিলো, আপনি সেটা বলছেন না কেন?’ পুরো রুম জুড়ে তখন নীরবতা, শিক্ষক আমাকে হাতে ধরে বাইরে নিয়ে আসলেন৷ প্রথমে রাগ করে আমাকে শাসাতে চাইলেন, পরক্ষনেই দেখলেন ভিতরের সবাই বিষয়টা নিয়ে কথা বলছে। তখন আমার হাত ধরে বললেন – আমি ভুল করেছিলাম, লোকের সামনে আর এরকম বলবে না।আমি তাকে ক্ষমা করিনি, অপরাধ না জানা পর্যন্ত আমি ক্ষমা করতে পারিও না। তবে সেদিনের মতো বিষয়টা ওখানেই থেমে যায়।

এরপর বেশ কয়েকবার সেই শিক্ষকের সাথে দেখা, আমি প্রতিবারই কারন জানতে চাই, তিনি কারন বলতে পারেন না। ইদানিং দেখলাম এই শিক্ষক আমাকে দেখলে রাস্তা পরিবর্তন করেন৷ হাটার গতি বেড়ে প্রায় দৌড়ের কাছাকাছি চলে যায়৷ আমি কোন গুন্ডা কিংবা সন্ত্রাসী নয়। আমার শিক্ষকরাও আমাকে ভালোবাসে, তবে এই শিক্ষক আমাকে ভয় পায়। ভয় পাওয়ার কারন কী সেটা আমি জানি না। জানতেও চাই না। আমি শুধু জানতে চাই আমাকে কেন মেরেছিলেন? আমি আমার শিক্ষকের জন্য এই প্রতিবাদ বন্ধের আরেকটা পথ খুলে রেখেছি। সেটাও আমি তাকে জানিয়ে রেখেছি। যেই প্রিন্সিপালের নিকট আমার নামে মিথ্যা বলেছিলেন সেই প্রিন্সিপালকে আমার সামনে আরেকবার কল করে বলুন ‘সাদিকের কোন দোষ ছিলো না, বস্তিতে লাইট মারার কাহিনি ছিলো মিথ্যা’ । এই কথাটি বললে আমি আর আপনাকে এই প্রশ্ন করবো না। আপনিও আমাকে দেখে আর দৌড়াতে হবে না। অন্যথায় হে প্রিয় শিক্ষক, আপনিও হয়তো জানেন আমি আপনাকে কী করতে পারি!

সুতরাং ২০০৭ থেকে আজ ২০২১, একটা ফোন কল আমার ১৪ বছরের জমিয়ে রাখা কষ্ট দূর করতে পারে। নয়তো আগামীতে এভাবেই আপনি দৌড়ের উপর থাকবেন। আমি মার খাওয়ার পরও যাদের নাম বলিনি সেই বন্ধুদের সাথে আজও ভালো সম্পর্ক আছে। আপনি ভুল স্বীকার না করলে কিছুদিন পর দেখবেন সাবেক যে কোন ছাত্রের সাথে দেখা হলেই সে আপনাকে প্রশ্ন করবে -সাদিককে মেরেছিলেন কেন? পরিস্থিতি কোন দিকে যাবে আশা করি কিছুটা ধারনা করতে পারছেন|

লেখক:সাদিক আহমদ ”ফেজবুক ওয়াল থেকে”