“মাহবুব হাফেজ হতে পারেনি, অত্যাচার থেকে বাঁচতে বার বার পালিয়ে যেতো”

85

হেফজখানার ঘটনা গুলো অনেকেই অনেক ভাবে উপস্থাপন করছেন। কে কীভাবে দেখছেন সেটা তাদের বিষয়। হেফজখানা কিংবা অভিভাবকরা একেবারে যে দুধে ধোয়া তুলসি পাতা সেটা আমাদেরকে কখনো বিশ্বাস করাতে পারবেন না। আমার জীবনে ঘটে যাওয়া কয়েকটি ঘটনার মধ্যে মাত্র একটি ঘটনা শুনেই আপনারা আমাকে নাস্তিক, দালাল কিংবা ভন্ড নাম দিচ্ছেন! অথচ আমাদের আরও কতো সত্য কাহিনি বলার এখনও বাকি। সেসব ঘটনা শোনার মতো ধৈর্য আপনাদের আছে বলে মনে হয় না। আপনাদের এই পক্ষ বিপক্ষ খেলার কারনে মূল উদ্দেশ্য অনেক পিছনে পড়ে যাচ্ছে। হেফজখানার উন্নয়ন ও অভিভাবকের পরিবর্তন থেকে আপনারা বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন কোন ব্যক্তিকে কার দালাল বানানো যায় সেটার উপর। আমার জীবনের গল্পটা জানানোর পর থেকে অনেক সিনিয়র, জুনিয়র আমার সাথে যোগাযোগ করে তাদের জীবনে ঘটে যাওয়া বিভিন্ন কাহিনির বর্ণনা দিয়েছেন। যার একটি আপনাদেরকে বলছি……………….

-আমাদের থেকে তিন চার বছরের জুনিয়র মাহবুব। ১২ বছর বয়সে হেফজখানায় ভর্তি হয়। ঘরের ছোট ছেলে হওয়ায় বাবা মায়ের আদরও ছিলো বেশি। ১০/১৫ দিন পর পর বাবা দেখতে আসতেন হোস্টেলে। এভাবে এক সময় হেফজখানার এক শিক্ষকের সাথে মাহবুবের বোনের বিয়ের আলাপ শুরু হয়৷ বিয়ের আলাপ শুরুর পর থেকে মাহবুবের প্রতি শিক্ষকের স্নেহ অনেকটা বেড়ে যায়। তবে সেই স্নেহ বেশিদিন টেকেনি। কোন কারনে বিয়ের আলাপ বন্ধ হয়ে যায়। এই বন্ধ হয়ে যাওয়াটাই হয় মাহবুবের দুঃখের কারন। সে এবার স্নেহের উলটো পিঠ দেখতে থাকে। কোন অপরাধে অন্যদের যে শাস্তি দেওয়া হতো মাহবুব তার থেকে তিন চার গুন বেশি শাস্তি পায় ।

সিনিয়র ছেলেরা সেটা নিয়ে মাহবুবের সাথে হাসি তামাশাও করে। শিক্ষক কী জন্য বেশি শাস্তি দিচ্ছেন সেটাও ছাত্রদের কাছে অজানা থাকলো না। বড়ো ছাত্ররা মাহবুবকে নিয়ে হাসাহাসি করে, শিক্ষক কারনে অকারণে মারে, এই পরিস্থিতি চলতে থাকে দিনের পর দিন।

হোস্টেলে ছাত্রদের জন্য পত্রিকা পড়া নিষেধ ছিলো। কোন ছাত্র পত্রিকা পড়লে সেটা বিরাট অপরাধ গণ্য করে শাস্তি দেয়া হতো। অফিস রুমে প্রতিদিন যে পত্রিকা আসে সেটা কেবল শিক্ষকরাই পড়ে। ছাত্রদের মধ্যে অনেকেই লুকিয়ে লুকিয়ে খেলার পাতা পড়ার অভ্যাস ছিলো। সেটাও ধরা পরলে বেত্রাঘাত নিশ্চিত। ঠিক এভাবেই এক বিকালে সবাই যখন মাঠে তখন কয়েকজন ছাত্র অফিসে যায় খেলার পাতা পড়ার জন্য৷ মাহবুবের পত্রিকা পড়ার অভ্যাস না থাকলেও সেদিন তাদের সাথেই মাদরাসা অফিসে ঢুকে। সেই সময় চলে আসেন একজন শিক্ষক। শিক্ষককে দেখে সবাই অফিস থেকে বের হয়ে যায়। শিক্ষক বিষয়টা জানান তার সিনিয়র শিক্ষকের কাছে, যার সাথে মাহবুবের বোনের বিয়ে হওয়ার কথা ছিলো। তিনি জানান এশার নামাজ শেষে বিচার হবে।

সন্ধ্যার পর পড়তে বসলে ছাত্ররা পড়ার ফাঁকে এটা নিয়ে আলাপ করে৷ সবাই বলাবলি করে অন্যদের যাই হোক মাহবুবের উপর আজ শাস্তির পরিমানটা একটু বেশিই হবে। মাহবুব এটা নিয়ে চিন্তায় পরে যায়। মাদরাসায় পত্রিকা পড়া বিরাট অপরাধ। যেখানে ছোট ছোট অপরাধের জন্য তাকে অনেক বেশি শাস্তি পেতে হয় সেখানে বড়ো অপরাধে কতটুকু নির্যাতন হতে পারে সেটা নিয়ে ভাবতে থাকে সে। একপর্যায়ে সিদ্ধান্ত নেয় যেভাবেই হোক মাদরাসা পালাতে হবে।

মাদরাসার মসজিদে এশার নামাজ একটু দেরিতে হয়। সেদিন নামাজের সময় সবাই যখন দ্বিতীয় রাকাতের সেজদায় তখন সে পিছনের কাতার থেকে নামাজ ভেঙে পালিয়ে যায়। নামাজ শেষে শিক্ষক দোষীদের সামনে আসতে বলেন। সবাই আসলেও মাহবুবের খোঁজ নেই। পুরো মাদরাসা তন্ন তন্ন করে খোঁজা হয়, মাদরাসার আশ পাশের এলাকায়ও কোন খোঁজ পাওয়া যায়নি তার। বাড়িতে যোগাযোগ করলে তারা জানায় বাড়িতেও পৌছায়নি সে।

পরের দিন দুপুরে খবর আসে সে বাড়িতে পৌঁছেছে, সন্ধ্যায় অভিভাবক তাকে ফেরত নিয়ে আসেন মাদরাসায়। আগের দোষের চেয়ে নতুন দোষ প্রাধান্য পায় বেশি। একের পর এক বেত্রাঘাত করা হয় তাকে । কিন্তু অভিভাবকও জানতে চায় না সে কীসের জন্য মাদরাসা পালিয়েছে, সারা রাতই বা কোথায় ছিলো? তারা ধরে নিয়েছিলো ছাত্র হেফজ পড়তে চায় না তাই পালিয়েছে, শয়তানের প্ররোচনায় পরেছে ।

শাস্তি শেষে মাহবুব আবার চলে আসে ক্লাস রুমে। বন্ধুরা জিজ্ঞেস করে কীভাবে সে পালিয়েছে? মাদরাসার প্রতিটা গেটে তালা ঝুলানো ছিলো! সারা রাতই বা কোথায় ছিলো ?

মাহবুব বন্ধুদের সাথে পালিয়ে যাওয়ার গল্প করে। মাদরাসার তিন তালার ছাদের পাশে যে সুপারি গাছ আছে সেই সুপারি গাছ বেয়েই নিচে নামে। তারপর দেয়াল টপকে মাদরাসার সীমানার বাইরে। সেখান থেকে বেশ কিছু দূর গিয়ে বাড়িতে যাওয়ার গাড়ি না পেয়ে আবার ফিরে আসে মাদরাসায়। মাদরাসার পিছনের দিকে বিল্ডিং আর সীমানা প্রাচীরের মাঝে যে ড্রেন আছে সেখানে কালবার্টের উপরেই শুয়ে বসে কাটায় সারা রাত। সকাল হলে সেখান থেকে বাজারে গিয়ে লোকাল গাড়িতে করে বাড়ি পৌঁছায়। বাড়িতে যাওয়ার পর স্নেহের বদলে পেতে হয় শাস্তি৷ বাবার আদরের সন্তান হলেও সেদিন তাকে শাস্তি দেন জন্মদাতা পিতা।

-মাহবুবকে হয়তো একসাথে খুব বেশি শাস্তি কখনো দেয়া হয়নি৷ তবে ধারাবাহিক অল্প অল্প শাস্তি তাকে এতটাই ভীত করে তুলেছিলো যে, মাত্র ১২ বছর বয়সে সে নিজেকে বাঁচানোর জন্য ঝুঁকিপূর্ণ পথ বেঁছে নেয়। একটা ১২ বছরের ছেলে যে গাছে উঠায় প্রশিক্ষত নয় সে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে কাজটি করে শিক্ষকের অত্যাচার থেকে নিজেকে বাঁচানোর জন্য৷ গাছ থেকে পড়ে গিয়ে তার মৃত্যু ঝুঁকিও ছিলো সেখানে, সেই ঝুঁকিকে তুচ্ছ করে সে আশ্রয়ের খোঁজে গিয়েছিলো বাবা মায়ের কাছে। কিন্তু হায়! যে আশ্রয়ে সে গিয়েছিলো সেই বাবা মা তাদের সন্তানের আর্তনাদ শুনতে ব্যর্থ হয়৷ তারা ধরে নেয় এটা শয়তানের প্ররোচনা। ফিরিয়ে দেয় আবার সেই হেফজখানায়, সেই শিক্ষকের কাছেই।

মাহবুব হাফেজ হতে পারেনি, অত্যাচার থেকে বাঁচতে বার বার পালিয়ে যেতো মাদরাসা থেকে। মাদরাসা আর পরিবার দুটোই তার শত্রু হয়ে দাঁড়ায়। একসময় সবাই আশা ছেড়ে দেয় কাঙ্ক্ষিত হাফেজ হওয়া থেকে। সে হয়ে যায় পরিবার ও সমাজের কাছে নষ্ট একটা ছেলে। যে হেফজখানায় থেকেও হাফেজ হতে পারেনি, তার মতো মন্দ কপালের লোক সমাজে আর কেই বা আছে। হায় সমাজ, তুমি মাহবুবের পালিয়ে যাওয়া দেখলে, কিন্তু পালিয়ে যাওয়ার কারন কখনো জিজ্ঞেস করলে না। যদি বাবা মা একবার জানতে চাইতো কেন সে মাদরাসা পালাচ্ছে তবে হয়তো সে তার মনের কথা বলতে পারতো। এই সমাজ হেফজখানার ছাত্রদের মনের অবস্থা জানতে চায় না। তারা এটাই ধরে নেয় যে, যে ছাত্র পড়তে চায় না সে শয়তানের ফাঁদে পড়েছে। তারা শয়তান তাড়ানোর ব্যবস্থা করে। তাড়াতে না পরলে সেটা কপালের দোষ বলে চালিয়ে দেয়। কিন্তু নিজেরা যে অযোগ্য পিতা-মাতা সেটা কখনো তারা জানতে পারে না।

মাহবুব এখন সৌদি আরবে একটি কোম্পানিতে গাড়ি চালকের চাকরি করে। প্রতি মাসে মাসে বাড়িতে টাকা পাঠায়। গতকাল মেসেঞ্জারে কল দিয়ে তার জীবনের গল্প বলে কান্না করে। এই কান্না আমার শোনার কথা ছিলো না। এটা শোনার কথা তার বাবা মায়ের। সমাজ মাহবুবকে কী দিতে পেরেছে? আঘাত আর অপমান ছাড়া? তোমার সন্তান হাফেজ না হওয়ার পিছনে তোমার ব্যর্থতা তুমি কীভাবে অস্বীকার করবে? কবে বুঝতে পারবে হেফজখানায় যে ছাত্র পড়ে তারও একটা সুন্দর জীবনের চাহিদা আছে? জেনে রাখো, তুমি অযোগ্য পিতা, অযোগ্য অভিভাবক । তোমার অযোগ্যতার কারনেই আজ হেফজখানার মান উন্নয়ন সম্ভব হচ্ছে না। যারা মান উন্নয়নের কথা বলছে তাদেরকে তুমি নাস্তিক কিংবা ইহুদিদের দালাল বলছো৷ তুমি অভিভাবকের অযোগ্যতার কারনেই মুষ্টিমেয় হেফজখানা ছাড়া অধিকাংশ হেফজখানাতেই শিশু নির্যাতন বন্ধ করা সম্ভব হচ্ছে না । জেনে রাখো, তুমি অযোগ্য অভিভাবক , অযোগ্য পিতা।

[ আপনারা যারা এসব নিয়ে লেখেন কিংবা বক্তৃতা করেন তাদের কার উদ্দেশ্য কী সেটা আমার জানা নেই। তবে এটা জানি আপনাদের এসব লেখা কিংবা বক্তৃতা হেফজখানার শিক্ষকরা কখনো পড়েনও না শুনেনও না। যারা পড়েন কিংবা শুনেন তারা হলেন অভিভাবক। তাই আমি মনে করি অভিভাবকরা সচেতন হলেই পরিবর্তন আসতে পারে। অন্যথায় সেটা সম্ভব নয় ]

লেখক:সাদিক আহমদ ”ফেজবুক ওয়াল থেকে”