উগ্র, হিংস্র ও অসহনশীল আচরণ ইসলামের উদাহরণ হতে পারে না

160
ইফতেখায়রুল ইসলাম, অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার
ইফতেখায়রুল ইসলাম, অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার

ইদানীং কেউ কেউ একটা লাইন খুব বলছেন যেমন, যে আলেম আপনার নামাজে জানাযা পড়াবেন তাকে নিয়ে কথা বলেন না! এই কথাটা এমন না হয়ে বরং হওয়ার কথা ছিল, দুই একজন লেবাসধারী আলেমের অপকর্মের জন্য সকল আলেম সমাজকে ঢালাওভাবে হেয় করেন না। প্রকৃত আলমেগণকে আমরা মুসলিম মাত্রই শ্রদ্ধা করি।

মুসলিমের নামাজের জানাজা পড়াবেন বলেই কারো চরিত্রের অসংগতি নিয়ে কথা বলা যাবে না, এর চাইতে দুর্বল যুক্তি আর কোথাও নেই। মিথ্যাকে সবসময় সত্য দিয়ে মোকাবেলা করতে হয় কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্যি, কেউ কেউ সত্য না পেলেও ঢালাও সাফাই গাওয়ার প্রক্রিয়ায় বিশ্বাসী হয়ে উঠেন আজকাল।

ইসলামকে যিনি বেশি জানেন, বুঝেন তাঁর সাথে একজন সাধারণ কম জানা মানুষের পার্থক্য আছে। আর ঠিক এজন্যই যিনি জানেন বেশি তাঁকে সম্মানিত স্থানে আসীন করা হয়। জেনে, বুঝে অপরাধ করা আর না জেনে বা কম জেনে অপরাধ করার মাঝে পার্থক্য বিশাল। না জানাদের মহান আল্লাহ চাইলেই যেমন ক্ষমা করতে পারেন তেমনি দুনিয়ার আদালতও পারেন৷ আর যিনি জেনে, বুঝে অপরাধ করেন তার জন্য দুই জীবনেই শাস্তি শিরোধার্য! কাজেই হাস্যকরভাবে ইসলামিক জ্ঞানসম্পন্ন কোনো মানুষের চরিত্রে অসংগতি থাকলে তা দিয়ে একজন সাধারণ মানুষের চরিত্রের অসংগতিকে মিলিয়েন না! দুজনের কৃতকর্ম অপরাধ হলেও দুজন একই মাপের নন। একজন আমাদের শেখান আরেকজন শেখেন এই পার্থক্য অনুধাবন না করতে পারলে, আপনার আলোচনায়ই আসা উচিত নয়।

একজন মুসলিম হিসেবে আপনি এই কথা কখনোই ভাবতে বা বলতে পারেন না যে আপনি আলেম বলেই আপনার বা অন্য কারো বেহেশত সুনিশ্চিত আর আরেকজন সাধারণ মানুষ বলেই তাঁর বেহেশত অনিশ্চিত। দুনিয়ার দৃশ্যমান ভাল, মন্দ কাজের বাইরে অদৃশ্যমান ভাল, মন্দ কাজেরও হিসেব থাকবে, সেটি মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলে দিয়ে যদি আপনি নিজে দুনিয়াতে জান্নাত, জাহান্নাম নির্ধারণ করে ফেলেন তাহলে তো সমস্যা! আপনি কে তা নির্ধারণ করার?

মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিন পূর্বে নবী, রাসূলগনদের মুজিযা বা ঐশ্বরিক ক্ষমতা প্রদান করেছিলেন যার প্রেক্ষিতে নবী, রাসূলগন নানা ক্ষমতার অধিকারী ছিলেন। আপনারা যারা দুটি সাদা চোখ দিয়ে পরকালের সিদ্ধান্ত দিয়ে ফেলেন তাঁরা যে কত বড় পাপ করছেন সেটি কি বুঝেন? জান্নাত, জাহান্নাম নির্ধারণ করবেন স্বয়ং আল্লাহ (সুবহানাহু তা’আলা)। সেটি আপনি যখন বলছেন তখন তা যে শির্ক হয়ে যাচ্ছে আপনার কম ব্যবহৃত মস্তিষ্ক তা ধরতে পারছে না?

ইসলাম ধর্মকে ব্যবহার করে যারা সহিংসতা উস্কে দিচ্ছেন, যারা ভাঙচুর, জ্বালাও, পোড়াও করছেন তারা ইসলামের বড় ক্ষতি করছেন। ইসলাম দাওয়াতের ধর্ম, সহনশীলতার ধর্ম! ইসলাম রাষ্ট্র ও রাষ্ট্রীয় সম্পদের সর্বোচ্চ নিরাপত্তা প্রদানে অঙ্গীকারাবদ্ধ! আর আপনি পুড়িয়ে ছাই করছেন, ইসলামকে বুকে ধারণকারী উগ্রতাকে নয় বরং সহনশীলতাকে অবলম্বন করে এগিয়ে যায়। প্রতিবাদের ভাষায় যদি আপনার ও সাধারণের মাঝে পার্থক্য না থাকে তবে নিজেকে আর অন্যভাবে বিশিষ্ট পরিচয়ে বিশেষায়িত করতে যেয়েন না।

ভাঙচুর আর নোংরামোকে সমর্থন দিয়ে নিজেদের ইসলামের ধ্বজাধারী বলে পরিচয় দিয়েন না। মাথায় রাখতে হবে ব্যক্তির চেয়ে ধর্মের অবস্থান অনেক ঊর্ধ্বে। ইসলামকে যার যার খুশিমত বিশ্লেষণকারীদের চাপে আমাদের মত সাধারণ ধর্মপ্রাণদের অবস্থা যায় যায়। ভাঙচুর আর অসহনশীলতা আমার শান্তির ধর্ম ইসলামের সঠিক বার্তা কখনোই দেয় না। এরুপ অসহনশীল আচরণে উদ্বুদ্ধ জ্ঞানীদের চেয়ে বরং একজন সাধারণ মুসলিম হিসেবেই নিজেকে পরিচিত করাতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করবো।

আমার বিশ্বাস সকল শান্তিপ্রিয় মুসলিমগণ এটাই চাইবেন। অযথা ধ্বংসযজ্ঞ সৃষ্টিকারী ও বিশৃঙ্খলাকারীদের সাথে প্রকৃত মুসলিমদের চাওয়া কখনোই মিলতে পারে না। দিনশেষে একটি বিষয় মাথায় রাখতে হবে, ইসলামকে ব্যবহার করে কেউ যদি ব্যক্তিগত ফায়দা হাসিলের চেষ্টায় রত থাকেন, তবে শেষ বিচারের দিন মহান আল্লাহপাক আপনাদেরও ছাড়বেন না। উগ্র, হিংস্র ও অযথা অসহনশীল আচরণ কখনোই ইসলামের উদাহরণ হতে পারে না।

লেখক: ইফতেখায়রুল ইসলাম, অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার (মিডিয়া অ্যান্ড পিআর), ডিএমপি।