১.৭৪ লাখ কোটি টাকা টিকায় লাভ

90

আগামী দুই বছরের মধ্যে দেশের ৭০ শতাংশ মানুষকে করোনার টিকা দেওয়া গেলে তাতে অর্থনীতিতে ২ হাজার ৪৮ কোটি ডলার বা পৌনে দুই লাখ টাকার আর্থিক সুফল মিলবে। আর ৭০ শতাংশ মানুষকে টিকা দিতে হলে টিকা কেনা থেকে শুরু করে সরবরাহ ব্যয়সহ কমপক্ষে খরচ হবে ১১৭ কোটি মার্কিন ডলার বা প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকা। এই অর্থ খরচ করে বিপুল মানুষের মধ্যে হার্ড ইমিউনিটি তৈরি করা গেলে তাতে অর্থনীতি ব্যাপকভাবে লাভবান হবে বলে বিশ্বব্যাংকের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।

বিশ্বব্যাংকের সম্প্রতি প্রকাশিত ‘সাউথ এশিয়া ইকোনমিক ফোকাস স্প্রিং ২০২১: সাউথ এশিয়া ভ্যাকসিনেটস’ প্রতিবেদনে বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর আগামী দুই বছরে ৭০ শতাংশ মানুষকে টিকা দেওয়ার জন্য কত অর্থ খরচ হবে, তা নিয়ে তিনটি সম্ভাব্য চিত্র দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া ওই প্রতিবেদনে বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর অর্থনীতিতে খরচের অনুপাতে টিকার সুবিধার বিশ্লেষণও তুলে ধরা হয়।

বিশ্বব্যাংকের ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, করোনার শুরুতেই যদি টিকা দেওয়া যেত, তাহলে দক্ষিণ এশিয়ার ১ লাখ ৮৮ হাজার মানুষকে বাঁচানো যেত, আবার মোট জিডিপির ২০ শতাংশের মতো ক্ষতি হতো না। কারণ, লকডাউন অনেক জীবন বাঁচিয়েছে কিন্তু জীবিকার ক্ষতি করেছে।

বিশ্বব্যাংক আরও বলেছে, টিকা দেওয়া হলেই সঙ্গে সঙ্গে অর্থনীতির ক্ষতি কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হবে, তা নয়। যে বিনিয়োগ ও প্রবৃদ্ধি হারিয়ে গেছে, তা আবার অর্জন করতে সময় লাগবে। কারণ, বহু ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ঋণখেলাপি হয়ে যাচ্ছে। বহু লোক বেকার হয়েছে। টিকা না দিলেও অর্থনীতির পুনরুদ্ধার হবে। তবে টিকা দিলে দ্রুত অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার হবে। ব্যবসা-বাণিজ্যের ক্ষতিও দ্রুত কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হবে। পুনরুদ্ধারের সময়সীমা কমে আসবে।বিজ্ঞাপন

এই বিষয়ে বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন বলেন, এখন আর টিকা দিলে কত খরচ হবে, তা চিন্তা করার সময় নেই। বিশ্বব্যাংক, এডিবি অর্থ দিচ্ছে। তাই টাকার জোগান বড় সমস্যা নয়। অর্থনীতি পুনরুদ্ধারে টিকা দেওয়াই সর্বোত্তম বিকল্প। এর কাছাকাছিও কোনো বিকল্প নেই। তাঁর মতে, টিকা প্রদান প্রক্রিয়ায় সমস্যা হলো, যথাসময়ে চাহিদা অনুযায়ী টিকা কিনতে পারব কি না। টিকা পাওয়ার যে গতি, তাতে আগামী বছরের মধ্যে ৭০ শতাংশ মানুষকে টিকা দেওয়া যাবে কি না, তা অনিশ্চিত। এ ছাড়া দেশের ১৩ কোটি মানুষকে টিকা দিতে হলে প্রতিদিন কত লোককে দিতে হবে এবং সেই অনুযায়ী সরবরাহ নিশ্চিত করাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।


বিশ্বব্যাংকের তিন হিসাব

বিশ্বব্যাংক তিনটি সম্ভাব্য খরচের হিসাব দিয়েছে। টিকা কেনার জন্য সরকার কত টাকা দেবে আর উন্নয়ন সহযোগী কত অর্থ দেবে, কাদের টিকা কেনা হচ্ছে ইত্যাদি নানা বিবেচনায় টিকার এ তিন সম্ভাব্য খরচের হিসাব করেছে বিশ্বব্যাংক।

তার প্রথমটিতে বলা হয়েছে, একজন ব্যক্তিকে দুই ডোজ টিকা দিতে সব মিলিয়ে খরচ হবে ১৯ ডলার বা ১ হাজার ৬১৫ টাকা (প্রতি ডলারের বিনিময় মূল্য ৮৫ টাকা ধরে)। আগামী দুই বছরে প্রায় ৭০ শতাংশ মানুষকে টিকা দিতে বাংলাদেশের খরচ হবে ১৯২ কোটি ডলার, টাকার অঙ্কে যার পরিমাণ প্রায় সাড়ে ১৬ হাজার কোটি টাকা। তিনটি সম্ভাব্য খরচের মধ্যে বিশ্বব্যাংক এটিকে বলেছে ‘হতাশামূলক’।

দ্বিতীয় সম্ভাব্য খরচের হিসাবে বলা হয়েছে, এক ব্যক্তিকে দুই ডোজ টিকা দিতে সব মিলিয়ে খরচ পড়বে ১৬ থেকে ১৭ ডলার। আর ৭০ শতাংশ মানুষকে টিকা দিতে সব মিলিয়ে খরচ হবে ১৩৬ কোটি ডলার বা সাড়ে ১১ হাজার কোটি টাকা। বিশ্বব্যাংক এই হিসাবকে বলছে ‘বাস্তববাদী’। সর্বশেষ হিসাবে দুই ডোজ টিকার দাম পড়বে ৬ ডলার। এ ছাড়া পরিবহন খরচ যুক্ত হবে। সব মিলিয়ে ৭০ শতাংশ মানুষকে টিকা দিতে ১১৭ কোটি ডলার বা প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকা খরচ হবে। এটিকে বিশ্বব্যাংক বলছে, ‘আশাবাদী’ হিসাব। কোভ্যাক্স টিকার দাম ধরেই এ খরচের হিসাব করা হয়েছে।

বিশ্বব্যাংক তৃতীয় হিসাবটিকে বিবেচনায় নিয়ে বলেছে, ৭০ শতাংশ মানুষকে টিকাদানের আওতায় আনতে বাংলাদেশকে ২০২১ সালের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) দশমিক ১০ শতাংশ এবং পরের বছর দশমিক ২৩ শতাংশ খরচ হবে। ২০২০ ও ২০২১ সালের মধ্যে দেশের ৭০ শতাংশ মানুষকে টিকা দেওয়া হলে তাঁদের মধ্যে একধরনের হার্ড ইমিউনিটি তৈরি হবে, যার ব্যাপক অর্থনৈতিক সুফল রয়েছে, বিশ্বব্যাংকের হিসাবে যার আর্থিক মূল্য প্রায় ২ হাজার ৪৮ কোটি ডলার বা পৌনে ২ লাখ কোটি টাকা।