দাদা ভোজনরসিক হওয়ায় আমার জিহবায়ও স্বাদের কমতি ছিল না

144

ছোটবেলায় যখন রমজান মাস চলে আসতো আমার ভীষণ মন খারাপ শুরু হয়ে যেতো, তখন রোজার মাহাত্ম্য অত বুঝতাম না! বাপ, দাদা ভোজনরসিক হওয়ায় আমার জিহবায়ও স্বাদের তখন কমতি ছিল না! প্রতিদিন প্রচুর আবোল, তাবোল খাবার বিভিন্ন দোকান থেকে কিনে খেতাম।

রমজান মাস চলে এলে এক মাসের জন্য আমার খাওয়া দাওয়ায় ছেদ পড়তো! সেই কষ্টেই রোজা শুরু হওয়ার আগের দিন আমার পছন্দের সকল খাবার কিনে প্রাণভরে খেয়ে নিতাম, সাথে একটু পরপর পানি খেতাম যেন পানি আর ইহজীবনে কপালে জুটবে না!

প্রথম রোজায় সেহরী খেয়ে আযানের অপেক্ষায় থাকতাম, আযান হলে মসজিদে জামাআতের সাথে নামাজ আদায় করতাম। ছোটবেলার রমজান মাস প্রায়ই শীতকালে আসতো বলে কম্বলের ভিতর থেকে বের হতে ইচ্ছে করতো না! গরম গরম ভাতের সাথে কত কী যে থাকতো। তখনও আযান হওয়ার আগে পর্যন্ত ঠেসে ঠেসে পানি খেতাম যেন সকালে পিপাসা না লেগে যায়। তারপর সারাদিন কষ্ট করে ঘড়ির কাঁটার দিকে তাকিয়ে থাকা।

আহা, কখন প্রত্যাশিত সেই আযানের ধ্বনি শুনবো আর নানান রকম শরবত পান করার সাথে ইফতার করবো। বাসায় মা জননী ইফতারের আয়োজন করে প্রথম থেকেই আত্মীয় স্বজন ও প্রতিবেশীদের বাসায় ইফতার পাঠাতেন। ছোট হওয়ায় আমি নিয়ে যেতাম।

কী চমৎকার সংস্কৃতি, কী চমৎকার মেলবন্ধন! এসব দেখেই আমাদের বড় হওয়া। তখনো আমাদের ভিতরটা ঠিক এতটা পঁচে যায়নি। তখনো মানুষের মাঝে সহমর্মিতা, ভালবাসা, শ্রদ্ধাবোধ ও আত্মমর্যদার জায়গাটা অনেক প্রখর ছিল। আমাদের সেই সেহরী তখনো মধ্যরাতের সেহরী পার্টির ফিউশনের মর্যাদা লাভ করেনি। সেটি ইবাদতের জায়গাতেই ছিল। ছিল মন থেকে ভালবাসার জায়গায়।

সময়ের পরিক্রমায় সবকিছুতেই পরিবর্তন আসে এবং এটা স্বাভাবিক। এই যেমন দাদী, বাবা, মায়ের সাথে একসাথে বসে সেহরী ও ইফতার করা এই আমরা, এখন শহরের এক কোণে নিজেরা নিজেদের মত সব করছি।

ইতোমধ্যে জীবনের সবচেয়ে বড় সম্পদ বয়োজ্যেষ্ঠ আত্মীয়, স্বজন সকলকে হারিয়ে নিজেরা এই বেশ বাঁচতে শিখে গেছি। যাদের সম্পদ আছে তাঁরা হয় করছে অবমূল্যায়ন নয়তো পেটের দায়ে প্রাণপ্রিয় বাবা, মায়ের কাছ থেকে আলাদা হয়ে নিজের মত সবকিছু চালিয়ে নিচ্ছেন। জীবনের দায়ে এই পরিবর্তন মেনে নিতেও আমরা শিখে গেছি।

করোনাকালে জীবনকে উপভোগ করাই থেমে গেছে প্রায়। বাবা, মা নেই বলে নির্দয়ের মত মনে মনে একটু আশ্বস্ত হই এই ভেবে যে, তাঁরা এখন বেঁচে থাকলে অনিশ্চয়তা, উৎকন্ঠা ও ভয়েই দিনাতিপাত করতে হতো। কখনো কখনো প্রাণের স্বজনের উপস্থিতি না থাকাও যে স্বস্তির হতে পারে, তা এই করোনা বুঝিয়ে গেলো।

এই দুর্যোগে ও পবিত্র রমজান মাসে বিচ্যুতি থেকে বের হওয়ার প্রত্যাশা আমরা মুখে বললেও বুকে ধারণ করবো কিনা তা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহের অবকাশ রয়েছে, কারণ আমাদের সৃষ্ট অতীত উদাহরণসমূহ। বিশ্বের সর্বত্র সংযমের মাসে বিনয় ও সংযমের আবির্ভাব ঘটলেও আমাদের মাঝে বিরাজ করে অস্থিরতা, দাম বৃদ্ধির এক অসুস্থ প্রতিযোগিতা এবং একইসাথে পঁচা, রং মেশানো পণ্যের সমাহার।

দুর্ভাগ্যজনকভাবে এই সংযমের মাসেই বিশেষ অভিযান পরিচালনার মাধ্যমে তাদের নিয়ন্ত্রণের চেষ্টাও করতে হয়, এই আমাদের দেশে। রন্ধ্রে রন্ধ্রে অনৈতিকতায় পূর্ণ এই আমাদের মুখে নৈতিকতা ও সংযম যেখানে জাস্ট কথার কথা সেখানে সেহরী, সেহরী পার্টি হয়ে গেলেইবা কার কী আসে যায়! তবুও দিনশেষে ছোটবেলায় আমাদের ছোট্ট, নিষ্পাপ মনে গড়ে উঠা বোধের জায়গা, অতি আদবের জায়গা সেহরীকে এখন সেহরী পার্টি হিসেবে মেনে নিতে আধুনিক এই মন বারবার হোঁচট খায়! অতি আধুনিকতার শৃঙ্খলে আবদ্ধ আমার অনাধুনিক মনই হয়তো এর জন্য দায়ী।

পবিত্র রমজান মাস আমাদের সংযমবোধ বাড়িয়ে দিক এবং এর উসিলায় মহান রাব্বুল আলামিন দুনিয়া থেকে করোনা নামক ব্যাধিকে সরিয়ে দিয়ে এই বসুধাকে আবারও প্রাণ খুলে শ্বাস নেবার সুযোগ করে দিন- এটিই মনের গভীরের কাঙ্ক্ষিত চাওয়া।

লেখক: ইফতেখায়রুল ইসলাম, অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার (মিডিয়া অ্যান্ড পিআর), ডিএমপি।