সংক্রমিত এলাকায় লকডাউনের পরামর্শ বিশেষজ্ঞদের

86

অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সচল রাখার স্বার্থে সারা দেশে একযোগে লকডাউন না-দিয়ে সংক্রমণের মাত্রাভেদে অঞ্চল বা এলাকাভিত্তিক দেওয়ার প্রস্তাব করেছেন দেশের শীর্ষস্থানীয় অর্থনীতিবিদ ও ব্যবসায়ীরা।

তারা বলেছেন, করোনার সংক্রমণ রোধে সারা দেশে একসঙ্গে লকডাউন দিলে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড স্থবির হয়ে যায়। থমকে যায় ব্যবসা-বাণিজ্যের গতি।

কমে যায় টাকার প্রবাহ। এতে মানুষের আয়ও কমে। স্বল্প আয়ের মানুষ বড় বিপাকে পড়ে। এসব ভোগান্তি এড়িয়ে করোনার মধ্যেও অর্থনীতিকে সচল রাখতে এই বিকল্প প্রস্তাব দিয়েছেন তারা।

করোনার ভয়াল থাবায় গত বছর বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি কমে সাড়ে ৪ শতাংশ নেতিবাচক হয়েছে। বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধিও কমেছে। বিশ্বের অনেক দেশে এখন চলছে করোনার তৃতীয় ঢেউ। বাংলাদেশে চলছে দ্বিতীয় ঢেউ। প্রথম ঢেউয়ের তুলনায় দ্বিতীয় ঢেউয়ের থাবা আরও ভয়াবহ।

বিশ্লেষকরা বলেছেন, করোনার সংক্রমণ শিগগির থামবে না। এটি চলমান থাকবে। সে কারণে এর সংক্রমণ বিবেচনায় নিয়েই অর্থনীতিকে সচল রাখতে হবে। চালাতে হবে ব্যবসা-বাণিজ্য। নির্বাহ করতে হবে মানুষের জীবন-জীবিকা। এর আলোকে সরকারকে নীতিনির্ধারণ করতে হবে।

এসব ক্ষেত্রে সরকারের সামনে রয়েছে ত্রিমুখী চ্যালেঞ্জ। একদিকে করোনার সংক্রমণের বিস্তার ঠেকানো, অন্যদিকে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সচল রাখা। তৃতীয়ত, বৈদেশিক বাণিজ্য আরও বাড়ানো। তাহলেই অর্থনীতিকে সামনের দিকে এগিয়ে নেওয়া সম্ভব হবে। এর মাধ্যমে দারিদ্র্য বিমোচন ও কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা যাবে।

প্রথম ঢেউয়ের মধ্যেই অনেক দেশ করোনা নিয়ন্ত্রণে বিভিন্ন ধরনের কৌশল উদ্ভাবন করেছে। দ্বিতীয় ও তৃতীয় ঢেউয়ে সেগুলোর প্রয়োগে সুফল পেয়েছে।

এর মধ্যে চীন প্রথম ঢেউয়ের পর দ্বিতীয় ঢেউ আসতেই দেয়নি। জার্মানি, সুইডেন, নিউজিল্যান্ড, যুক্তরাজ্য তৃতীয় ঢেউ মোকাবিলা করছে। মালয়েশিয়া দ্বিতীয় ঢেউ সফলভাবে মোকাবিলা করছে। ভারতে করোনা ভয়াবহ রূপ নিলেও পুরো দেশে লকডাউন দেওয়া হয়নি। সীমিত আকারে রাজ্যভেদে লকডাউন দেওয়া হয়েছে।এসব প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশেও করোনার বিস্তার রোধ করে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সচল রাখার জন্য বিকল্প ব্যবস্থা নেওয়ার প্রস্তাব এসেছে। দেশের শীর্ষস্থানীয় অর্থনীতিবিদ, ব্যবসায়ী ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোও একই ধরনের অভিমত দিয়েছেন।

তারা বলেছেন, করোনা আছে, থাকবে। এটি রেখেই অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড এগিয়ে নিতে হবে। এ জন্য এখন থেকে আর সারা দেশে একসঙ্গে লকডাউন নয়। যেখানে সংক্রমণ সেখানেই লকডাউন। সংক্রমণের বাইরে দেশের অন্যান্য স্থানে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড স্বাভাবিক রাখতে হবে এবং স্বাস্থ্যবিধি মেনে করোনার সংক্রমণ প্রতিরোধ করতে হবে। বাড়াতে হবে সচেতনতা।

স্মার্ট লকডাউনের নীতিমালার আওতায় সংক্রমণপ্রবণ এলাকায় আন্তঃজেলা গণপরিবহণে বন্ধ রেখে শ্রমিকদের বিকল্প সহায়তা করতে হবে। মার্কেট বা শপিংমল একেবারে বন্ধ না-রেখে দিনের নির্দিষ্ট সময় খোলা রেখে ভিড় যাতে না-হয়, সে বিষয়টি মার্কেট কর্তৃপক্ষকে নিশ্চিত করতে হবে।

সংক্রমণ এলাকার বিনোদন কেন্দ্রগুলো বন্ধ রাখা যেতে পারে। যেসব সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে বাসায় বসে কাজের সুযোগ রয়েছে, সেগুলোয় ‘ওয়ার্ক ফ্রম হোম’ বা বাসায় বসে কাজ করার নীতি চালু করতে হবে।

নীতিমালায় বলা হয়, করোনা সংক্রমণের হটস্পট, সাময়িক হটস্পট, সম্ভাব্য ঝুঁকিপূর্ণ হটস্পট এভাবে সারা দেশকে চিহ্নিত করে ঝুঁকি বিবেচনায় ব্যবস্থা নিতে হবে।

এদিকে করোনার মধ্যে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সচল রাখতে আর্থিক খাতের নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর সম্প্রতি এক বৈঠকে সারা দেশে একসঙ্গে না দিয়ে সংক্রমিত এলাকায় লকডাউন দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে। একসঙ্গে লকডাউন দিলে সংক্রমিত নয়, এমন এলাকায়ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড স্থবির হয়ে যাচ্ছে। এতে মানুষের ক্ষতি হচ্ছে। এ কারণে শুধু সংক্রমিত এলাকায় লকডাউন দিলে ওই এলাকা থেকে যেমন ছড়ানোর সুযোগ কমবে, তেমনি সংক্রমিত নয় এমন এলাকাগুলো কার্যক্রম চালু রাখা যাবে। এতে অর্থনীতি সাময়িকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে, তবে স্থবির হবে না।

এ প্রসঙ্গে পল্লি কর্মসহায়ক ফাউন্ডেশনের (পিকেএসএফ) উপব্যবস্থাপনা পরিচালক ফজলুর কাদের বলেন, সারা দেশে স্বল্প আয়ের অনেক মানুষ আছে যারা দিন আয়ে চলে। কোনো সঞ্চয় নেই। তাদের কর্মকাণ্ড চালানোর সুযোগ দিতে হবে। এ কারণে স্মার্ট লকডাউনের প্রস্তাবটি যুক্তিসংগত। সূত্র জানায়, গত ৫ এপ্রিল থেকে চলছে টানা বিধিনিষেধ। শেষ হওয়ার কথা ২৮ এপ্রিল। এরপর আংশিক শিথিল করার কথা। বর্তমানে ঢাকা, চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, রাজশাহী, গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জসহ বেশকিছু এলাকায় করোনার ঝুঁকি বেশি। কিন্তু অনেক অঞ্চল রয়েছে যেগুলোয় করোনার প্রকোপ নেই। ফলে ওইসব এলাকাও লকডাউনের আওতায় বাধাগ্রস্ত হচ্ছে ব্যবসা-বাণিজ্য।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেন, অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড যত বেশি বাড়বে, তত দ্রুত টাকার হাতবদল হবে। টাকার হাতবদল বেশি হওয়া মানেই অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বাড়ছে। এতে যারা অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত তাদের হাতেই টাকার প্রবাহ কিছু কিছু যাচ্ছে।

যা দিয়ে তারা জীবিকা নির্বাহ করছে। বাড়তি অর্থ সঞ্চয় বা বিনোদনে ব্যয় করছে। কিন্তু লকডাউনে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড স্থবির থাকলে টাকার হাতবদল কমে যায়। তখন অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে সব মানুষের যুক্ত হওয়ার সুযোগ কমে যায়। ফলে একটি শ্রেণির হাতে টাকা যায় না। তাদের জীবিকা সংকটে পড়ে।