একটি ছোট্ট ক্ষেত ও আমাদের জীবন

143

৩ গজ বর্গাকার একটা এক্সপেরিমেন্টাল ক্ষেত বানিয়েছিলাম বাসার কাছেই। লাগিয়েছিলাম মরিচ আর বেগুন গাছ। সম্ভবত ক্লাস সিক্সে পড়ি তখন! পাশেই বড় ক্ষেতের মালিক এক আংকেল বললো, চাচা এরকম ফ্যাশন কইরা ক্ষেত লাগাইয়া কি লাভ? তোমাদের কি আর এসব লাগে! আচ্ছা তাও সময়মত যত্ন নিও, পানি দিও। আমি নিয়মিত সকাল, বিকাল পানি দিতাম, আগাছাও পরিস্কার করতাম। অনেকদিন হয়ে যায় কিন্তু মরিচ আর বেগুন কোনো গাছেই ফুল আর আসেনা! মনটা ভীষণ খারাপ হয়ে গেলো।

একদিন সকালে যেয়ে দেখি মরিচের সাদা সাদা ফুল ও বেগুনের বেগুনী ফুল ধরেছে গাছে। খুশিতে চোখে পানি চলে আসলো। সন্তানের মত আগলে রাখছিলাম গাছগুলোকে! কিছু গাছে যত্ন কম হওয়ায় শুকিয়ে কাঠ হয়ে গিয়েছিল, তবে কিছু গাছ যত্ন পেয়ে মরিচ ও বেগুনে ভরে উঠছিল। যেদিন পরিকল্পনা করলাম আমার যত্ন করা বেগুন ও মরিচ এবার তুলে নিয়ে আসবো, সেদিনই দেখলাম গাছে বেগুন আর মরিচগুলো নেই! শুধু কয়েকটি গাছে দুই, একটি মরিচ রেখে গেছে কেউ দয়া করে!

আমার এত যত্নের গাছের শেষ রক্ষা হয় নাই, কোনো এক দু পেয়ে মানুষ ছিনিয়ে নিয়েছে আমার জীবনের কষ্টসাধ্য অর্জন। আবারও চোখ ভরে গেলো। এখন মনে মনে ভাবি এত যত্ন করেই তো শেষ রক্ষা হয়নি আমার সন্তানসম গাছগুলোর। আর আমার অযত্নে প্রাথমিক অবস্থায় ঝরে পড়া গাছগুলোকে আর কি দোষ দেবো তবে?

স্থান, কাল, পাত্র ভেদে কিছু মানুষকে যে কত সমস্যার মধ্য দিয়ে যেতে হয়, সেটি সেই মানুষের অবস্থানে নিজেকে না দাঁড় করানো পর্যন্ত বুঝা মুশকিল! আমাদের সমাজ সবসময় সিদ্ধান্ত দিয়ে দেয়। এই যেমন আমার বেগুন গাছে বেগুন না দেখে আমার এক দোস্ত টিপ্পনী কেটে বলেছিল, কি ঘোড়ার ডিম লাগিয়েছিলা দোস্ত, একটা বেগুনও তো নাই। সে আমার কষ্টও দেখে নাই, সে আমার বেগুন চুরি হয়ে যাওয়াও দেখে নাই। সে শুধু দৃশ্যমান ফলাফলের উপর সিদ্ধান্ত শুনিয়ে দিয়েছিল আমাকে! করুণা কি নিজের জন্য হবে নাকি আমার দোস্তের মত মানুষদের জন্য, আমি আসলেই মিলাতে পারি না!

কারো জীবন কেউ যাপন করে না, তা-ই যাপিত জীবনে মানুষের সংগ্রামও কেউ বুঝে উঠতে পারে না! যে যার জায়গা থেকে বিষয় ভাবে এবং এটি স্বাভাবিক। তবে, সুচিন্তিত ভাবনায় আমাদের একাত্মতা কম থাকলেও অসুস্থ ভাবনার ক্ষেত্রে আমরা আবার সম্মিলিতাবে একই ধারণা পোষণ করি। এভাবেই হয়তো চলবে শেষ দিন পর্যন্ত!

আহা জীবন! তুমি কেন অসুস্থ মস্তিষ্কের অসুস্থ ভাবনা থেকে বাঁচাও না আমায় ।

লেখক: ইফতেখায়রুল ইসলাম, অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার (মিডিয়া অ্যান্ড পিআর), ডিএমপি।
(ফেসবুক থেকে সংগৃহীত)