গঙ্গা নদী ভরে উঠছে কোভিডে মৃতদের লাশে

127

ভারতে মাত্র কয়েকদিনেই সারি সারি লাশে ভরে উঠেছে হিন্দুদের সবচেয়ে পবিত্র নদী গঙ্গা। নদীতে ভাসমান কিংবা নদী তীরের বালিতে চাপা পড়া অবস্থায় পাওয়া যাচ্ছে শত শত লাশ।

উত্তর প্রদেশের এলাহাবাদে কয়েকদিন ধরে গঙ্গায় লাশ ভেসে আসছে। এগুলো করোনাভাইরাসে আক্রান্তদেরই মৃতদেহ বলে শঙ্কায় আছে স্থানীয়রা। স্থানীয় প্রশাসন থেকে ভাসমান লাশগুলো নদীর পাড়ে নিয়ে গিয়ে পুড়িয়ে ফেলা হচ্ছে বা কবর দেওয়া হচ্ছে।

করোনাভাইরাসের দ্বিতীয় ঢেউয়ে রীতিমত বিপর্যস্ত ভারত। বিশ্বের মধ্যে সেখানেই এখন দৈনিক সর্বোচ্চ রোগী শনাক্ত হচ্ছে। সরকারি হিসাবমতে, ভারতে মোট আক্রান্তের সংখ্যা আড়াই কোটি ছাড়িয়ে গেছে। মোট মৃত্যু দুই লাখ ৭৫ হাজারের বেশি। যদিও বিশেষজ্ঞদের ধারণা, সরকারি হিসাবের তুলনায় প্রকৃত মৃত্যু কয়েকগুণ বেশি।

দেশটিতে দৈনিক এত মানুষ মারা যাচ্ছে যে শ্মশানে বা কবরস্থানে মৃতদেহ সৎকারের জায়গা হচ্ছে না। গঙ্গা নদীতে যেসব মৃতদেহ ভেসে আসছে সেগুলোও হয়ত সরকারি হিসাবে অদেখা বা অজানাই থেকে যাচ্ছে।

উত্তর প্রদেশের যেসব জেলায় করোনাভাইরাস সংক্রমণের বিস্তার বেশি হয়েছে, সেসব জায়গার স্থানীয় সাংবাদিক, কর্মকর্তা এবং প্রত্যক্ষদর্শীদের সঙ্গে কথা বলে গঙ্গা নদীতে এই বিপুল সংখ্যক লাশ ভেসে আসার কারণ জানতে পেরেছে বিবিসি।

বলা হচ্ছে, মহামারীতে ‍অল্প সময়ে অনেক বেশি মানুষের মৃত্যু এবং প্রাচীন বিশ্বাস ও  দারিদ্র্যের কারণে ‍অনেকেই স্বজনদের মৃতদেহ নদীতে ভাসিয়ে দিচ্ছেন।

গত ১০ মে বিহার রাজ্যের চৌসা গ্রামে গঙ্গা নদীর পাড়ে একদিনে ৭১টি লাশ ভেসে এলে প্রথম এ নিয়ে হইচই শুরু হয়।

তখন বক্সার নগর পুলিশের সুপারিনটেনডেন্ট নিরাজ কুমার সিং বলেছিলেন, নদীতে ভেসে আসা লাশের অধিকাংশই ছিল অর্ধগলিত। তারা ময়নাতদন্তের পর ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ করে সেগুলো নদীর পাড়েই কবর দিয়েছেন।

তার পরদিন চৌসা থেকে ছয় মাইল দূরে উত্তর প্রদেশের গাজিয়াবাদ জেলার গাহমার গ্রামে গঙ্গা নদীর পাড়ে আরও বেশ কিছু লাশ ভাসতে দেখা যায়। যেগুলো কুকুর, কাকে ছিঁড়ে খাচ্ছিল।

স্থানীয়রা জানিয়েছিলেন, গত কয়েকদিন ধরেই তারা নদীতে লাশ ভেসে আসতে দেখেছেন। প্রশাসনকে লাশ ভেসে আসার খবর দেওয়া হলেও বিষয়টি আমলে না নিয়ে অবজ্ঞা করে গেছে। পরে বিহারে নদীতে লাশ ভাসতে থাকার খবর প্রকাশের পর প্রশাসন নড়েচড়ে বসে।

প্রতিবেশী বালিয়া জেলায়ও লোকজন ভোরে পবিত্র গঙ্গা নদীতে স্নান করতে গিয়ে অনেক অর্ধগলিত লাশ নদীতে ভাসতে দেখেন। পরে হিন্দুস্তান টাইমস পত্রিকার খবরে বলা হয়, সেখানে ৬২টি লাশ পাওয়া গেছে।

এছাড়া, কাননৌজ, কানপুর, উন্নাও এবং প্রয়োগরাজ জেলাও নদীর পাড়ে ভেসে আসা অনেক লাশ মাটিচাপা দেওয়া হয়েছে।

বিবিসি-কে পাঠানো একটি ভিডিওতে কাননৌজ জেলার মেহেন্দি ঘাটের কাছে নদীর পাড়ে মানবদেহের সমান অনেক ঢিবি দেখতে পাওয়া যায়। প্রতিটি ঢিবিতে আসলে এক একটি লাশ মাটিচাপা দেওয়া।

কাছের মহাদেবী ঘাটে নদীর পাড়ে অন্তত ৫০টি মৃতদেহ পাওয়া গেছে।

ভারতে হিন্দুরা সাধারণ মৃতদেহ পুড়িয়ে দেয়। কিন্তু অনেক সম্প্রদায়ের মধ্যে ‘জল প্রবাহ’ নামে একটি প্রাচীন রীতি চালু আছে। যে রীতিতে শিশু, কুমারী মেয়ে, সাপের কামড়ে মারা যাওয়া বা কোনও সংক্রামক রোগে মারা যাওয়াদের মৃতদেহ নদীতে ভাসিয়ে দেওয়া হয়।

অনেক দরিদ্র পরিবার সৎকারের অর্থ যোগাড় করতে না পেরেও স্বজনদের মৃতদেহ নদীতে ভাসিয়ে দেয়। কখনও কখনও মৃতদেহের সঙ্গে পাথর বেঁধে দেওয়া হয় যাতে সেগুলো নদীর গভীরে তলিয়ে যায়। ফলে স্বাভাবিক সময়েও গঙ্গা নদীতে লাশ ভেসে থাকার ঘটনা একেবারে বিরল নয়।

কিন্তু এখন এত কম সময়ে বিভিন্ন জায়গায় গঙ্গা নদীতে যত বেশি লাশ ভেসে আসতে দেখা যাচ্ছে তা মোটেই স্বাভাবিক নয়। কানপুরের স্থানীয় এক সাংবাদিক বিবিসি-কে বলেন, একসঙ্গে নদীতে এত লাশ ভেসে আসা ‘নিশ্চিতভাবেই করোনাভাইরাস মহামারীতে মারা যাওয়ার ব্যক্তিদের সরকারি হিসাব এবং প্রকৃত সংখ্যার মধ্যে বড় ধরনের তফাত নির্দেশ করছে।”

তিনি বলেন, গত ১৬ এপ্রিল থেকে ৫ মে’র মধ্যে সরকারি হিসাবমতে, কানপুরে কোভিড-১৯ এ আক্রান্ত হয়ে ১৯৬ জন মারা গেছে বলে জানানো হয়। অথচ ওই সময়ে জেলার সাতটি শ্মশানে প্রায় আট হাজার মৃতদেহ পোড়ানো হয়েছে।

‘‘এপ্রিল থেকে শ্মশানের সবগুলো বৈদ্যুতিক চুল্লি দিনরাত জ্বলছে। কিন্তু তাতেও কুলিয়ে ওঠা যাচ্ছে না বলে কর্তৃপক্ষ শ্মশানের বাইরে মাঠের মধ্যেও কাঠ দিয়ে মৃতদেহ পোড়ানোর অনুমতি দিয়েছে।”

‘‘অথচ শ্মশান থেকে শুধুমাত্র ওইসব মৃতদেহ গ্রহণ করা হচ্ছে যারা হাসপাতালে মারা গেছেন এবং কোভিড-১৯ এ মারা যাওয়ার সনদ আছে। কিন্তু বহু মানুষ কোনও পরীক্ষা বা চিকিৎসা ছাড়াই বাড়িতে মারা যাচ্ছেন। তাদের স্বজনরা ওইসব মৃতদেহ নগরীর বাইরে বা আশেপাশের জেলায় নিয়ে গিয়ে সৎকারের চেষ্টা করছে।”

“যখন তারা সেখানেও শ্মশানে জায়গা পাচ্ছে না বা কাঠ যোগাড় করতে পারছে না, তখন বাধ্য হয়ে তারা হয় মৃতদেহগুলো মাটিতে পুঁতে ফেলছে বা নদীতে ভাসিয়ে দিচ্ছে।”

প্রয়োগরাজের আরেক সাংবাদিক বলেন, “নদীতে ভেসে আসা এইসব মৃতদেহের বেশিরভাগই কোভিড আক্রান্তদের, যারা কোনও পরীক্ষা ছাড়াই বাড়িতে মারা গেছেন। অথবা দরিদ্র পরিবারের, যাদের পক্ষে সৎকারের অর্থ যোগাড় করা সম্ভব হয়নি।”

‘‘এটা খুবই হৃদয়বিদারক, এইসব লাশ কারও বাবা, কারও মা, কারও ছেলে বা মেয়ের। মৃত্যুর পর কিছুটা সম্মান তাদের প্রাপ্য। তারা সেটা পাচ্ছেন না, তারা এমনকী মৃতদের পরিসংখ্যানেও জায়গা পাচ্ছেন না। তাদের কথা কেউ জানতে পারছে না, তারা অজ্ঞাতই থেকে যাচ্ছেন।”