ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পেছনের ইতিহাস

48

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় মানেই এক জীবন্ত ইতিহাস, ইতিহাসের এক চলমান অধ্যায় এ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রের জন্মের ইতিহাসের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে এই বিশ্ববিদ্যালয়। এ ঐতিহাসিক প্রতিষ্ঠানের আনাচকানাচে ছড়িয়ে–ছিটিয়ে রয়েছে ইতিহাস, রচিত হয়েছে ইতিহাসের নানা অধ্যায়। বটতলা, মধুর ক্যানটিন, কলাভবন, শহীদ মিনার এমন কোনো জায়গা নেই এই বিশ্ববিদ্যালয়ের, যেখানে বাঙালি ও বাংলাদেশের ইতিহাস তার কোনো কোনো পর্ব উন্মোচন করেনি। আর এ ঐতিহাসিক প্রতিষ্ঠানের প্রতিষ্ঠার পেছনের ইতিহাসও কম চমকপ্রদ নয়।

১৯২১ সালের জুলাই মাসে ৩টি অনুষদের অধীনে (বিজ্ঞান, কলা ও আইন) ১২টি বিভাগ ও ৮৪৭ জন ছাত্রছাত্রী নিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু করা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠার বীজ বপন হয়েছিল ১৯১১ সালে বঙ্গভঙ্গ রদের ঘটনার মধ্য দিয়ে। ১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গের মাধ্যমে ঢাকাকে রাজধানী করে পূর্ব বাংলা ও আসামকে নিয়ে যে আলাদা রাজ্য গঠিত হয়েছিল, তা এ অঞ্চলের মুসলিমপ্রধান জনগোষ্ঠীর দীর্ঘদিনের আশা ও চাওয়া–পাওয়ারই বাস্তব প্রতিফলন। এটা এই অঞ্চলের মুসলমানদের শিক্ষা, অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়নে এবং সর্বোপরি তাদের স্বাবলম্বিতা অর্জনের ক্ষেত্রে বিশেষ সহায়ক ছিল। কিন্তু নান বিরোধিতার মুখে ইংরেজ সরকার ১৯১১ সালে বঙ্গভঙ্গ ব্যবস্থাকে বাতিল ঘোষণা করতে বাধ্য হয়, যা বঙ্গভঙ্গ রদ নামে পরিচিত।

সেই সময় কলকাতার তথাকথিত উচ্চশিক্ষিত ও হিন্দু নেতারা ঢাকায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা রোধে স্মারকলিপি প্রদান করেই ক্ষান্ত থাকেননি, তাঁরা প্রতিবাদ সভা থেকে শুরু করে র‍্যালি পর্যন্ত আয়োজন করেছিলেন।

বঙ্গভঙ্গ রদের ঘটনায় পূর্ব বাংলার মুসলিম জনগণ ব্যাপকভাবে ক্ষুব্ধ ও আশাহত হন। ঢাকার তৎকালীন নবাব স্যার খাজা সলিমুল্লাহর নেতৃত্বে একদল মুসলিম জনপ্রতিনিধি, যার মধ্যে ‘বাংলার বাঘ’ খ্যাত এ কে ফজলুল হক ও সৈয়দ নওয়াব আলী চৌধুরী অন্যতম, বঙ্গভঙ্গ রদের ক্ষতিপূরণ হিসেবে এই অঞ্চলের মানুষের ভাগ্য উন্নয়নে এখানে একটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার দাবি জানান সর্বপ্রথম ১৯১২ সালের ৩১ জানুয়ারি।

ভাইসরয় লর্ড হার্ডিঞ্জের ঢাকা পরিদর্শনকালে এই দাবি তোলা হয়। সেই সময়ে পূর্ব বাংলায় ৯টি কলেজ থাকলেও উচ্চশিক্ষার জন্য কোনো বিশ্ববিদ্যালয় ছিল না। পরে এই অঞ্চলের মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের দাবিকে সম্মান জানিয়ে লর্ড কার্জন বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার আবেদনে সম্মতি দেন এবং তার ফলে একই বছরের ২ ফেব্রুয়ারি ভারতীয় রাজ্য সরকার কর্তৃক বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার সপক্ষে একটি আনুষ্ঠানিক ঘোষণাপত্র প্রকাশিত হয়।

এরই ধারাবাহিকতায় একই বছরের ৪ এপ্রিল বাংলার রাজ্য সরকারকে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পূর্ণাঙ্গ প্রস্তাবনা প্রণয়নের আহ্বান জানানো হয়। এ লক্ষ্যে ২৭ মে ১৩ সদস্যবিশিষ্ট একটি কমিটি গঠিত হয় স্যার রবার্ট নাথানিয়েলের নেতৃত্বে, যা ‘নাথান কমিটি’ নামে পরিচিত। এ কমিটি দ্রুততার সঙ্গে রিপোর্ট প্রদান করে ১৯১২ সালের শেষ দিকে।

১৯১৩ সালে নাথান কমিটি রিপোর্ট জনমতের জন্য প্রকাশিত হয় এবং একই বছরের ডিসেম্বরে তা অনুমোদন লাভ করে। এরপর প্রথম বিশ্বযুদ্ধের ডামাডোলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রকল্প স্থগিত থাকে দীর্ঘদিন। ১৯১৭ সালের নভেম্বরে ইংরেজ সরকার ‘স্যাডলার কমিশন’ গঠন করে পূর্ববর্তী ‘নাথান কমিশনে’র রিপোর্টকে পর্যালোচনা করে ও কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে সাংঘর্ষিক বিষয়গুলোকে বিবেচনা করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে নতুন করে রিপোর্ট দিতে। এই ‘স্যাডলার কমিশন’ তাদের রিপোর্ট প্রদান করে ১৯১৯ সালের মার্চে।

১৯১৭ সালে সৈয়দ নওয়াব আলী চৌধুরী তৎকালীন ব্রিটিশ-ভারতের আইন সভা Imperial Legislative Council-এ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা ও নিবন্ধনের জন্য আইন প্রণয়নের উদ্দেশ্যে একটি বিল উত্থাপন করেন। পরে এটি পাস হয় ১৯২০ সালের ২৩ মার্চ ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় অ্যাক্ট ১৯২০’ নামে, যার অধীনে পূর্ব বাংলার প্রথম বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু করে আজ থেকে ১০০ বছর আগে ১৯২১ সালের ১ জুলাই।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পেছনে যে ব্যক্তিটি মুখ্য ভূমিকা পালন করেন, তিনি আর কেউ নন, ঢাকার চতুর্থ নবাব, ব্রিটিশ রাজত্বের সময়কার উপমহাদেশের অন্যতম রাজনীতিবিদ, পূর্ব বাংলার শিক্ষা বিস্তারের অগ্রদূত স্যার খাজা সলিমুল্লাহ। বঙ্গভঙ্গ আন্দোলনের পুরোধা ব্যক্তিত্ব স্যার সলিমুল্লাহ ঢাকাতে একটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার দাবি মূলত ১৯১১ সালের আগস্টেই কার্জন হলে এক রাজনৈতিক সমাবেশে উত্থাপন করেছিলেন। পরে তাঁর এই দাবি সর্বজনীন রূপ পায় ১৯১১ তে বঙ্গভঙ্গ বাতিলের পর। স্যার সলিমুল্লাহর দান করা ৬০০ একর জমিতেই ১৯২১ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।